একটি মিষ্টি প্রেমের গল্প

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   

নিনিতা সেই দিনটার কথা এখনো ভুলতে পারেনা। নিনিতার বয়স যখন তেরো তখনি একদিন তার চাচাতো ভাই সাজু তাকে তাড়াহুরা করে টেনে নিয়ে একটা রুমে ঢুকিয়ে দরজা লাগিয়ে দেয়।সাজু সেবার এস এস সি পরীক্ষার্থী।নিনিতার বয়স তেরো হলেও তার বুঝতে বাকী রইলনা যে তার চাচাত ভাই সাজু তাকে কোন অসৎ উদ্দেশ্যেই রুমে আটকেছে।সে ভয়ে চিৎকার দিতে চেয়েও পারলোনা।সাজু তার মুখ চেপে ধরলো।নিনিতার সেই সময় নিজেকে বড় অসহায় মনে হয়েছিল। এই ভর দুপুরে এ রুমের আশেপাশেও কারোর আসার কথা নেই।নিনিতার তার সাজু ভাই সম্পর্কে এতদিন মনে মনে যে ধারনা ছিল সেটা বুঝি আজ মিথ্যা প্রমানিত হতে যাচ্ছে।ইশ! পুরো বাড়ির মধ্যে সাজু ভাইকেই সে সবচেয়ে বেশী পছন্দ করতো।

নিনিতার তিন চাচার মধ্যে নিনিতাই একমাত্র মেয়ে।আর বাকী সবার দুটো করে ছেলে।সাজু তার ছোট চাচার বড় ছেলে।প্রতিদিন স্কুল থেকে নিনিতার জন্য কোন না কোন মজার জিনিস নিয়ে আসবেই সে।কিছুদিন আগে নিনিতাকে কোথা থেকে যেন একটা টিয়ার বাচ্চাও এনে দিয়েছে।সাজু বিলে গেলে নিনিতাকে নিয়ে যায়।সাজু সাঁতরে গিয়ে নিনিতার জন্য শাপলা সালুক তোলে আনতো মাঝ বিল থেকে শুধু নিনিতার অনুরুধে।নিনিতার অন্য চাচাতো ভাইদের কাছে হাজার কান্নাকাটি করলেও কেউ নিনিতাকে বিলে মাছ ধরা দেখতে নিয়ে যায়নি কখনো।ওরা বলে,এত বড় মেয়েকে বিলে নিয়ে গেলে লোকে কি বলবে?কিন্তু সাজু কখনো সেসবের তোয়াক্কা করেনি।সে সবার কথা উপেক্ষা করে নিনিতাকে খুশি করার জন্য বিলে নিয়ে যেত বড়শি দিয়ে মাছ ধরার সময়।সাজু যখন বড়শিতে বড় বড় মাছ উঠাতো নিনিতা তখন অানন্দে ছটফট করতো।খুশিতে চিৎকার দিয়ে উঠতো অার নিনিতার এই অানন্দমাখা মুখটা দেখে সাজুও অনেক তৃপ্তি পেত।সাজু মাছ ধরে যতটা না খশি হত নিনিতার অানন্দ দেখে তার থেকে বেশী খুশি হত।

একমাত্র সাজু ভাই ই নিনিতার আবদারগুলো রাখে। ওকে প্রজাপতি ধরে দেয়,ফড়িং ধরে দেয়। প্রজাপতি ফড়িং নিয়ে খেলতে খুব ভালবাসে নিনিতা। কয়দিন আগে সাজু ওকে ফড়িং ধরার একটা নতুন কৌশল শিখিয়ে দিয়েছে।পাটকাঠির মধ্যে কাঁঠালের কষ লাগিয়ে ফড়িংয়ের গায়ে লাগিয়ে দিলেই ফড়িং পাটকাঠির মধ্যে আটকে যায়।গত বছর একুশে ফেব্রুয়ারির সময় নিনিতার সে কি কান্না!সবারই ফুল আছে কেবল নিনিতারই নেই।সেই কান্না দেখে সাজু কোথা থেকে যেন দুটো তাজা গোলাপ নিয়ে দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলেছিল

-এই নে ফুল।লাগলে আরো এনে দিব।তবু কাঁদিস না। তোর কান্না আমি একদভ সহ্য করতে পারিনা। কথাগুলো বলতে বলতে সাজুর চোখেও পানি চলে এসেছিল।সাজু নিজের হাতে নিনিতার চোখ মুছে দিয়েছিল।আর তখনি নিনিতা দেখতে পেল যে সাজুর হাত দুটো থেকে তর তর করে রক্ত পড়ছে।নিনিতা অবাক হয়ে সাজুর হাত দুটো নিজের ছোট হাতের মুঠোয় নিয়ে বলেছিল

-সাজু ভাই,তোমার হাতে রক্ত কেন?
-ও কিছু না।দেয়াল টপকে মুন্সীর বাগান থেকে
ফুল চুরি করতে গিয়ে বাউন্ডারির দেয়ালে লাগানো ছোট ছোট কাঁচের টুকরোয় লেগে একটু
কেঁটে গেছে।ওমনি নিনিতা তার সাজু ভাইয়ের পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখে পা দুটো থেকেও রক্ত পড়ছে।নিনিতা কি ভেবে যেন তার সাজু ভাইকে সেদিন খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিল।তাহলে কি সেই জড়িয়ে ধরাটাই নিনিতার জন্য কাল হয়ে দাড়িয়েছে?সাজু ভাইকে সে নিজের শুভাকাঙ্খী ভাবতো।যে সাজু ভাই নিনিতার সামান্যটুকু ক্ষতি কোনদিন হতে দেয়নি আর সেই সাজু ভাই-ই আজ তার এমন কুৎসিত রুপ দেখাতে যাচ্ছে।নিনিতা রাগে দুঃখে সাজুর বানিয়ে দেয়া বকুল ফুলের মালাটা একটানে গলা থেকে ছিঁড়ে ফেলে দিল।ওমনি সাজু রেগে অগ্নিমূর্তি হয়ে ঠাস করে একটা থাপ্পর বসিয়ে দিল নিনিতার গালে।নিনিতা এবার ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদতে শুরু করলো।সাজু ওর হাত ছেড়ে দিল।নিনিতা এই সুযোগে দৌড়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল রুমটা থেকে পালাবে বলে। সাজু পেছন থেকে ডেকে বললো

-যাসনা নিনি।পূর্ব পাড়ার তালেব মুন্সী এসেছে বাড়ি। জানিসইতো উনি চোখ খাওয়া মানুষ।উনার নজর খুব খারাপ।একবার যদি কোনকিছুকে সুন্দর বলে বা কোনকিছুর উপর নজর দেয় তাহলে সেই জিনিস আর ঠিক থাকেনা।মনে নেই তোর,গতবছর আমাদের পাটক্ষেতকে সুন্দর বলার আধাঘন্টার মধ্যে ক্ষেতের সব গাছ মরে গিয়েছিল।বড় কাকার ছোট ছেলে ফাহিমের খাওয়ার রুচি নিয়ে প্রশংসা করায় ফাহিমের সেদিনই ডায়রিয়া হয়ে যায়।নিনি ঐ বদনজরওয়ালা লোকটা তোর ঐ চাঁদমুখ খানা দেখে যদি কিছু বলে দেয় তাহলে নির্ঘাত তোর একটা অসুখ বিসুখ বেঁধে যাবে।যাসনে নিনি,তোকে আমার দোহাই লাগে বাহিরে যাসনে এখন।সাজুর কথা শুনে মুহুর্তেই নিনিতার ভেতরে যেন কি হয়।ঘৃনা হয় নিজের উপর।ছিঃ এই মানুষটাকে নিয়ে এতক্ষন কি বাজে কল্পনাই না করেছে সে।নিনিতার ভেতরে কেমন যেন একটা কষ্ট হয়।সাজু ভাইর জন্য তার ভেতরে একটা চাপা কষ্ট হয়।সে দৌড়ে এসে সাজুর সামনে দাড়ায়।তার চোখে তখনও জল চিক চিক করছে।ভ্যান্টিলেটরের ফাঁক দিয়ে আসা আবছা আলোয় নিনিতা লক্ষ করলো সাজুর চোখেও জল।নিনিতা সাজুর হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরে বললো “তুমি সারাজীবন এমনি করেই আমার খেয়াল রেখো সাজু ভাই”
.
সাজু নিনিতার সেই কথা রাখতে দীর্ঘ অাট বছর পর পবিত্রভাবেই নিনিতার হাত ধরারর ব্যাবস্থা করেছে। অাজ যখন বাড়িভর্তি মেহমানের চোখ ফাঁকি দিয়ে সাজু দুষ্টুমি করে নিনিতাকে অাবার হ্যাঁচকা টানে নিজের রুমে ঢুকিয়ে দরজা অাটকে দিল। নিনি সেদিনটার কথা মনে করে অানমনেই একটা চাপা লজ্জার হাসি হেসে উঠলো।

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.